২০১৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নশীপে কাঠমান্ডুর হালচকের আর্মড পুলিশ ফোর্স স্টেডিয়াম ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে সুনীল ছেত্রির গোলে ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল বাংলাদেশ। জিততে না পারায় বিদায় নিয়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকেই। সেই মাঠে রোববার জামাল ভূইয়ারা যখন অনুশীলন করছিলেন, তখনই ছয় বছর আগের দুঃসহ স্মৃতিতে হারিয়ে গিয়েছিল সবাই।
বাংলাদেশ ফুটবল দলের জন্য আক্ষেপের এক গল্প। কিন্তু সাফের সেই দুঃখটা একপাশে রাখলে বাংলাদেশের ফুটবলের সোনালী হাসিটা হিমালয়ের দেশ থেকেই শুরু হয়েছিল। সোমবার সেই নেপালের কাঠমান্ডুতে সোনালী পদকের জন্যই খেলতে নামছে বাংলাদেশ ফুটবল দল। প্রতিপক্ষ ভুটান। দুপুর সোয়া একটায় শুরু হবে ম্যাচটি।
১৯৯৯ সালে সাউথ এশিয়ান গেমসের ফুটবলে বাংলাদেশ প্রথম স্বর্ণ জিতেছিল নেপালে। কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে ২০ বছর আগে আলফাজ-জুয়েল রানারা উড়িয়ে ছিলো লাল-সবুজের পতাকা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতার শহরে আবারো সোনার মেডেল গলায় পরানোর স্বপ্ন জামাল ভূইয়াদের। দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে ভুটানের মুখোমুখি হবেন নবীব নেওয়াজ জীবন-আনিসুর রহমান জিকোরা।
ফুটবল থেকে ভারত নাম প্রত্যাহার করে নেয়ায় সিঙ্গেল লিগভিত্তিক খেলা হবে। যে কারণে চার দিনে তিনটি ম্যাচ খেলতে হবে লাল-সবুজের দলকে।
সূচিতে পরিবর্তন হওয়ার পরই আটঘাট বেঁধে নামে জেমি ডে’র দল। শুরুতে নেপালের প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর উচ্চতার সাথে মানিয়ে নিতে বেগ পেতে হয়েছিল ফুটবলারদের। আস্তে আস্তে কন্ডিশনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া জামালরা এখন বেশ আত্মবিশ্বাসী।
১৯৯৯ সালে সুখকর স্মৃতির কথাটা মনে করিয়ে দেয়ার পর অধিনায়ক জামাল ভুইয়া বললেন, ‘তাই নাকি। এবার তাহলে জিততেই হবে। আমরা জেতার জন্যই এখানে এসেছি। বিশ বছর আগের পুনরাবৃত্তি এবার করতে পারব বলে বিশ্বাস আছে। শতভাগ নয়, এক শ’ বিশ ভাগ মেলে দিতে তৈরি সবাই। আমরা আত্মবিশ্বাসী।’
এস এ গেমসে ফুটবলে সর্বশেষ স্বর্ণ বাংলাদেশ জিতেছিল ২০১০ সালে ঢাকায়। সাম্প্রতিক সময়ের পারফরম্যান্স এবং ফুটবল ডিসিপ্লিনে ভারত না থাকায় সবকিছু মিলিয়ে এবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে বাংলাদেশের বড় বাধা নেপাল। তিন বছর আগের গেমসে ভারতকে হারিয়ে নেপাল জিতেছিল স্বর্ণ। কিন্তু অতদূর এখন ভাবছেন না জামাল। সব পরিকল্পনা শুধুই ভুটান ম্যাচ। ২০১৬ সালের অক্টোবরে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের পরাজয় বাদ দিলে ফুটবলের যেকোনো পর্যায়ে ভুটানের কাছে কখনোই হারেনি লাল-সবুজের দলটি।
গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত তিনটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচে ভুটানকে হারিয়েছিলেন জামালরা। সেই দলটি ছিল জাতীয় দল। এটা অনূর্ধ্ব-২৩। অবশ্য বাংলাদেশের বর্তমান দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ের বয়সের গড় ২৩। তাই একসাথে খেলার কারণে সবার সাথে বোঝাপড়াটাও দারুণ। এটাই বাংলাদেশ দলের বড় শক্তি।
ক্লাব ম্যাচে অহরহ গোল পেলেও জাতীয় দলের জার্সিতে গোল করতে যেন ভুলে যান জীবন। কেন এমনটা হয়? জীবনের ভাষ্য, ‘আসলে এটা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কি হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে গোল করার প্রচুর সুযোগ পাই। এবারের এসএ গেমসে টানা তিন-চার ম্যাচে যদি গোল করতে পারি, তাহলে আবারো আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে।’
প্রতিপক্ষ ভুটান কী বড় বাধা? এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ কোচের উত্তর, ‘ভুটান অবশ্যই ভালো টিম। ঢাকায় আমরা তাদেরকে হারিয়েছিলাম। সেটা এখন অতীত। প্রথম ম্যাচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরাও জয় দিয়ে শুরু করতে চাই।’
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ফুটবল দল বেশ ভালোই খেলছে। কিন্তু তাদের মূল সমস্যা হলো আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সেভাবে গোল আসছে না। এ প্রসঙ্গে নাবিব নেওয়াজ জীবন বলেন, ‘হ্যাঁ, কয়েকটি ম্যাচে আমি গোল করার অনেক সুযোগ নষ্ট করেছি। তবে আশা করছি এবার এসএ গেমসে আমি সুযোগ পেলে গোল করবো। এ নিয়ে আমি আলাদাভাবে অনেক কাজ করেছি। আশা করি স্কোরিং সমস্যা দূর করতে পারবো। এবং গোল করে দলকে জেতাতে পারবো। ভুটানের বিপক্ষে অনেকবারই আমরা খেলেছি। তাদের বিপক্ষে সাফে আমরা কখনই হারিনি। নিজেদেও সেরা নৈপুণ্যটা দিতে পারলে এবারো তাদেরকে হারাতে পারবো ইনশাআল্লাহ। যদিও আমাদের টানা ম্যাচ খেলতে হবে, এটা খুব কষ্টকর। তারপরও আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত এবং সিরিয়াস।’
না হারার মানসিকতা তো অনেক আগে থেকেই হৃদয়ে গেঁথে গেছে ইয়াসিন-বিপলুদের। ফুটবলারদের মনে জয়ের তাড়নাটা ঢুকিয়ে দিয়েছেন কোচ জেমি ডে। নেপালের কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নিতে পারবে কিনা তিনিও এটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। হিমালয়ের দেশে ফুটবলের অতীত সাফল্যের গল্পটা শুনার পর একটু চাপ অনুভব করছেন জেমি। যদিও কথায় তার ছিটেফোটাও মনে হয়নি, ‘না কোনো চাপ নেই। ছেলেরা সবাই তৈরি আছে। ১৯৯৯ সালে সাফ গেমসে ফুটবলে বাংলাদেশ স্বর্ণ জিতেছিল। এবারও আমাদের টার্গেট সর্বোচ্চ পদকটিই। তবে এটা কঠিন। কারণ সবাই এখানে জিততে এসেছে। দলটা তরুণ বলে শক্তির ব্যবধানটাও খুব বেশি নেই। প্রথম ম্যাচ খেলার অপেক্ষায় আছি। দলের সবাই ফিট এবং সুস্থ। ভুটানকে আমরা ঢাকায় সম্প্রতি দুবার হারালেও এই পরিসংখ্যানকে পাত্তা দিতে চাই না। এখানে তাদের আমরা সমীহই করছি। ভাল খেলতে পারলে আমরা ভুটানকে হারাতে পারবো, এটুকু বলতে পারি। প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলতে এলে হোটেলগুলোতে জিম সুইমিং সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত। আরেকটা কথা না বলে পারছি না। আমি কখনই এ রকম টাইট শিডিউলে ফুটবল হতে দেখিনি।’