বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৮

গেমের নেশা এক প্রকার মানসিক রোগ

প্রযুক্তির উৎকর্ষে শিশুরা প্রতিনিয়তই আনন্দ খুঁজে ফিরছে কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের পর্দায়। অনেক সময় এ গেমসের প্রতি তাদের আকর্ষণটা চলে যাচ্ছে আসক্তির পর্যায়ে। অবাক করার বিষয় হলো, বিভিন্ন ডিভাইসে গেম খেলার প্রতি নেশাকে একটি মানসিক রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। শিশুরা গেম খেলবেই। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন সেটা মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়। লিখেছেন সুমনা শারমিন
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ১১তম ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজেস বা আইসিডিতে এটিকে ‘গেমিং ডিজঅর্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত খসড়ায় গেমিং আসক্তিকে বর্ণনা করা হয়েছে এমন এক ধরনের আচরণ হিসেবে, যা জীবনের আর সব কিছুর আকর্ষণ থেকে একজনকে দূরে সরিয়ে রাখে। বিশ্বের কিছু দেশে গেমিং আসক্তিকে ইতোমধ্যে একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যসহ কিছু দেশে তো ইতোমধ্যে এর চিকিৎসার জন্য প্রাইভেট অ্যাডিকশন ক্লিনিক পর্যন্ত রয়েছে।
গেমিং আসক্তিকে কখন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করা হবে, তার বিস্তারিত আছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এই গাইডলাইনে।
এতে বলা হয়েছে, ১২ মাস সময় ধরে অস্বাভাবিক গেমিং আসক্তি বা আচরণ দেখা গেলে তা নির্ণয়ের পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে কারও ক্ষেত্রে যদি অস্বাভাবিক আচরণের মাত্রা অনেক বেশি তীব্র হয়, তখন ১২ মাস নয়, তার আগেই ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে গেমারদের মধ্যে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেমন: গেমিং নিয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। গেমিংকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া। নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও গেমিং অব্যাহত রাখা বা আরো বেশি গেমিং করা।
লন্ডনের নাইটিংগেল হাসপাতালের টেকনোলজি অ্যাডিকশন স্পেশালিস্ট ডা: রিচার্ড গ্রাহাম বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ফলে আরো বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে করে এ ধরনের গেমিং আসক্তিকে লোকে আরো গুরুত্বের সাথে নেবে। 
তবে যারা গেমিং আসক্তিকে একটি মানসিক ব্যাধি হিসেবে দেখার বিপক্ষে, তাদের প্রতিও তিনি সহানুভূতিশীল। 
তিনি স্বীকার করছেন, অনেক বাবা-মা এ নিয়ে বিভ্রান্ত হতে পারেন। কেবল গেমিংয়ে উৎসাহী বলে সন্তানদের তারা ‘অসুস্থ’ বলে ভাবতে পারেন।
ডা: রিচার্ড গ্রাহাম জানান, বছরে তিনি ডিজিটাল আসক্তির প্রায় ৫০টির মতো কেস দেখেন। এই আসক্তির কারণে তাদের ঘুম, খাওয়া-দাওয়া, সামাজিক মেলামেশা এবং শিক্ষার ওপর কি প্রভাব পড়ে, সেটার ওপর ভিত্তি করে আসক্তির সমস্যার মাত্রা বোঝার চেষ্টা করা হয়।
রোগী দেখার সময় একটা জিনিসকেই তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। এই গেমিং আসক্তি ‘নিউরোলজিক্যাল সিস্টেম’কে কতটা প্রভাবিত করছে। এটি চিন্তার ক্ষমতা বা নিবিষ্ট থাকার ক্ষমতার ওপর কী প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বের অনেক দেশই গেমিংয়ের আসক্তি নিয়ে চিন্তিত। দক্ষিণ কোরিয়ায় তো সরকার এমন আইন করেছেÑ যাতে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুরা মধ্যরাত হতে ভোর ৬টা পর্যন্ত অনলাইন গেম খেলতে না পারে।
জাপানে কেউ যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের বেশি গেম খেলে তাকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। চীনে সেখানকার সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান টেনসেন্ট শিশুরা কতক্ষণ গেম খেলতে পারে তার সময় বেঁধে দিয়েছে।
চীনের অনলাইন ভিডিও গেম বাজারে উল্লেখযোগ্য দখল রেখেছে স্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানি টেনসেন্ট হোল্ডিংস। চীনের তরুণ প্রজন্ম অনলাইন গেমে অত্যধিক আসক্ত হয়ে পড়ায় দেশটির সরকার তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। গেম বাজারে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকলে সঙ্কটে পড়বে টেনসেন্ট। তাই এ সঙ্কট এড়াতে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের অনলাইন গেমিংয়ের সময় বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 
চলতি বছরের শুরুর দিকে টেনসেন্ট তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গেম ‘অনার অব কিংসের’ জন্য নিবন্ধন পদ্ধতি চালু করে। এতে গেমারদের পরিচয় ও বয়স যাচাই করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়। আগামী বছর থেকে টেনসেন্ট তাদের সব গেমের জন্যই নিবন্ধন পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ বছরের কম বয়সী শিশুরা দিনে এক ঘণ্টা গেম খেলতে পারবে। এর চেয়ে বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তা দুই ঘণ্টা হবে।
চীনের শিশুরা গেমে আসক্ত হয়ে পড়ায় তাদের চোখের সমস্যা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে চীন সরকার এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
শেয়ার করুন